বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ১৯ টি জিআই পণ্যের একটি হচ্ছে কাটারি নাজির চাল। বলে রাখা ভালো, GI Product (Geographical Indication) অর্থাৎ জিআই পণ্য বলতে মূলত ভৌগোলিক নির্দেশক বুঝানো হয়। সহজ ভাষায়, ভৌগোলিকভাবে স্বীকৃত কোনো সামগ্রীকে নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করার অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা প্রদান করে GI. কাটারি নাজির চালের মহত্ত্ব সম্পর্কে কথা বলা নিষ্প্রয়োজন।

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য হচ্ছে চাল। ধান থেকে খোসা ছাড়িয়ে বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই চাল উৎপাদন করা হয়। চালের বিভিন্ন জাতের মধ্যে কাটারি নাজির চাল অন্যতম।  চালের জাত এবং গড়ন অনুসারে চাল ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। যেমনঃ আমন, আউশ, ইরি, বোরো ইত্যাদি। এছাড়াও গন্ধ এবং স্বাদের উপর ভিত্তি করে চাল কে আরও কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমনঃ বাসমতী, কালিজিরা, গোবিন্দভোগ, চিনিগুরা ইত্যাদি।

কোথায় পাওয়া যায় কাটারি নাজির চাল?

এই সকল সুগন্ধিযুক্ত চালের মধ্যে কাটারি নাজির চাল অন্যতম। এটি বাংলাদেশের অন্যতম একটি সুগন্ধিযুক্ত চাল। কাটারি নাজির চাল প্রধানত দিনাজপুর এলাকার দিকে পাওয়া যায়। দিনাজপুরের কাটারিভোগ বাংলাদেশের একটি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য।

দিনাজপুরের কাটারি নাজির চাল এতটাই বিখ্যাত যে, এক সময় এই কাটারি নাজির চাল সরকারি কাজ আদায়ের জন্য কিংবা রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি কিংবা নেতাদের উপহার হিসেবে দেয়া হত। এছাড়াও এই কাটারি নাজির চাল বিভিন্ন ধরণের সামাজিক অনুষ্ঠানেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই চাল দিয়ে সুস্বাদু ফিরনি, জর্দা,পায়েশ রান্না করা হয়। এই কাটারি নাজির চাল থেকে চিঁড়াও উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এই চিঁড়াগুলো হালকা সাদা এবং মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত।

কাটারি নাজির চাল ও পৌরাণিক কাহিনী

দেশের সবচাইতে প্রসিদ্ধ এই চাল নিয়ে নানা ধরণের পৌরাণিক কল্পকথা প্রচিলিত আছে। কথিত রয়েছে যে, তৎকালীন দিনাজপুরের যে রাজা ছিলেন, রাজা প্রাণনাথ। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের ফলে তাকে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে ডেকে পাঠানো হয়। তখন রাজা প্রাণনাথ সম্রাটের কাছে যাওয়ার সময় নানান ধরণের উপঢৌকন, স্বর্ণমুদ্রা ছাড়াও এই কাটারি নাজির চাল নিয়ে যান। তখন সম্রাট সেই সকল উপঢৌকন বা স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে যতটুকু না খুশি হয়েছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি হয়েছিলেন এই কাটারি নাজির চাল পেয়ে। ফলস্বরূপ, সম্রাট খুশি হয়ে রাজা প্রাণনাথকে “মহারাজা” উপাধিতে ভূষিত করেন।  

এই চাল দেখতে লম্বা, সরু এবং সম্মুখভাগ ছুরির মত চোখা এবং বাঁকা যা উৎপাদনের জন্য উচু বেলে-দোআঁশ মাটি বেশি উপযোগী। এটা শুধুমাত্র দিনাজপুর অঞ্চলের কিছু এলাকাতেই হয়ে থাকে। তার মধ্যে করিমুল্যাপুর, খানপুর, পশ্চিম বাউল ও কাহারোল অন্যতম। 

কাটারি নাজির চালের গুণাগুণ

আমাদের দানাদার খাদ্যের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ভাত। এছাড়াও আমাদের প্রতিদিনের খাবারের ক্যালারি অনেক বড় একটা অংশই আসে চাল বা ভাত থেকে। দেখতে সরু এবং লম্বা হওয়ায় এই চালের ভাত ঝরঝরে এবং সুস্বাদু হয়।

এই চালের ভাত ঝরঝরে, সুস্বাদু এবং এর দামও বেশ সাশ্রয়ী। রান্না করার পর ভাত আরও বেশি লম্বাটে হয়ে যায় এবং সুগন্ধযুক্ত চাল হওয়ায় এর গন্ধ আপনাকে বিমোহিত করবে। এছাড়াও এর মধ্যে যে ফাইবার রয়েছে তা আপনাকে নিরোগ এবং সুস্থ রাখতে সহায়তা করবে।  

উৎপাদন প্রক্রিয়া

কাটারি নাজির ধান প্রাকৃতিকভাবে চাষ করা হয় যা রাসায়নিক ও বিষমুক্ত। ধান শেষ রাতে সিদ্ধ করে ৫ দিন ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে চাল করা হয় এতে করে চালের গুনগত মান ঠিক থাকে। এছাড়াও কাটারি নাজির চালের বহুবিধ পুষ্টিগুন রয়েছে। এই চালে কোন কৃত্রিম সুগন্ধি ব্যবহার করা হয় না, এ জন্য এর মধ্যে একদম অথেনটিক গন্ধটাই বিদ্যমান থাকে। চালের বাইরের অংশে মূলত ফাইবার থাকে, কিন্তু সাধারণত চাল পলিশিং এর কারনে সেই ফাইবার কাটা পড়ে যায়। ফলে এর পুষ্টিগুণ কমে যায়। কিন্তু আমাদের এই কাটারি নাজির চাল পলিশিং করা হয় না। ফলস্বরূপ এর ফাইবার অক্ষুন্ন থাকে। এতে উন্নত মানের ফাইবার বা আঁশ থাকার দরুন এটি আপানার ওজন কমাতে সাহায্য করবে। এই চাল গ্রামের হাস্কিং মিলে ভাঙানো স্বাস্থ্যসম্মত চাল।

পুষ্টির বিচারে কাটারি নাজির চাল

কাটারি নাজির একদম অর্গানিক এবং নানাবিধ পুষ্টিগুন সম্পন্ন। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট এবং ক্যালোরির চমৎকার উৎস। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে সেলেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ মিনারেল, ফসফরাস এবং ক্যালসিয়াম। এটি আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য এবং কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে অনেক ফলপ্রসূ। এই চাল ক্ষতিকর ইউরিয়া, পলিশ, ব্রাইটনার ও স্যালাইন পানি মুক্ত। এই চাল সম্পূর্ণ খুদ এবং পাথরমুক্ত হওয়ায় এটি খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু।  

রোগ প্রতিরোধে কাটারি নাজির চালের ভূমিকা

এটা আপনার ডায়বেটিস প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই চালে নিউরোট্রান্সমিটার সদৃশ কেমিক্যাল রয়েছে যা আপনার অ্যালজাইমার রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এছাড়াও এতে রয়েছে, ভিটামিন-বি যা আপনার বিপাকীয় কাজ, চুল ত্বকের উন্নতি, ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ, রক্তাল্পতা প্রতিরোধে সাহায্য করে থাকে।  

মিনিকেট বনাম কাটারি নাজির চাল

এখন আপনার মনে হতে পারে যে, মিনিকেট চালও তো খেতে পারেন শুধু শুধু এই কাটারি নাজির কেন খাবেন? এর কারন বর্তমানের যে সকল মিনিকেট চাল বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলো মূলত আসল মিনিকেট না। এগুলো হাইব্রিড চাল যা মেশিনে কেটে ছোট ছোট করে মিনিকেট বানানো হয়। এটা মূলত মোটা চালকে কেটে কেটে ছোট চিকন চালে পরিণত করে বাজারে মিনিকেট নামে চালানো হয়। কিন্তু আমাদের এই কাটারি নাজির চাল দিনাজপুর থেকে উৎপাদিত হয়ে সরাসরি ভোক্তার হাতে পৌছায়। আসল কাটারি নাজির চাল ১০০% ভেজালমুক্ত পরিবেশে প্রস্তুত করা হয়। 

এই জন্য কাটারি নাজির চাল এক আস্থার নাম। আপনার এক বিশ্বস্ত সহযোগী। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

X